চলচ্চিত্র সাংবাদিক: ফাহিম শাহরিয়ার রুমি
বাংলাদেশের নাটক ও চলচ্চিত্র অঙ্গনের পরিচিত মুখ এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা শামস সুমন আর নেই। দীর্ঘদিন অভিনয়, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমে সক্রিয় থাকা এই শিল্পী ২০২৬ সালের ১৭ মার্চ সন্ধ্যায় ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৭ মার্চ সন্ধ্যা প্রায় ৬টা ৪৫ মিনিটে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে (কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট) তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৫৮ বছর। জানা যায়, সেদিন বিকেলে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয় তাঁকে। তবে চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও তাঁকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
শামস সুমনের জন্ম রাজশাহীতে। ছোটবেলা থেকেই তিনি সাহিত্য ও সংস্কৃতির আবহে বড় হন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ছাত্রজীবনে তিনি আবৃত্তি সংগঠন “স্বনন”-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশ নিতেন। এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে অভিনয়ের জগতে নিয়ে আসে।
মঞ্চনাটকের মাধ্যমে তাঁর অভিনয় জীবন শুরু হয়। ধীরে ধীরে টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্রে কাজ করে তিনি নব্বইয়ের দশকে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তাঁর অভিনয়ের বৈশিষ্ট্য ছিল সংযত আবেগ, স্বাভাবিক সংলাপ উপস্থাপন এবং চরিত্রের গভীর অনুভূতি সহজভাবে প্রকাশ করার দক্ষতা।
শামস সুমন বিভিন্ন সময় বহু আলোচিত চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে—
জয়যাত্রা (২০০৪), বিদ্রোহী পদ্মা (২০০৬), নমুনা (২০০৮), হ্যালো অমিত (২০১২), আয়না কাহিনী (২০১৩), প্রিয়া তুমি সুখী হও (২০১৪), মন জানে না মনের ঠিকানা (২০১৬), কক্সবাজারে কাকাতুয়া (২০১৬) এবং চোখের দেখা (২০১৬)।
এই চলচ্চিত্রগুলোর মাধ্যমে তিনি বহুমাত্রিক চরিত্রে অভিনয়ের দক্ষতা দেখিয়েছেন।
অভিনয়ে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ২০০৮ সালে ‘স্বপ্নপূরণ’ চলচ্চিত্রে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এটি তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি গণমাধ্যমেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বেসরকারি এফএম রেডিও স্টেশন “রেডিও ভূমি”-এর স্টেশন চিফ হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। অভিনয়ে সাম্প্রতিক সময়ে কম সক্রিয় থাকলেও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান।
শামস সুমন ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। মঞ্চ, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র এবং রেডিও—সব ক্ষেত্রেই তিনি অবদান রেখেছেন। সহকর্মীদের মতে, তিনি ছিলেন বিনয়ী, পরিশ্রমী এবং সংস্কৃতিপ্রেমী একজন মানুষ। তাঁর মৃত্যুতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন গভীর শোক প্রকাশ করেছে।
তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহকর্মী, নির্মাতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা শোক প্রকাশ করেছেন। অনেকেই তাঁর অভিনয়শৈলী ও ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের নাটক ও চলচ্চিত্র জগতে তাঁর অবদান দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিনেতা শামস সুমনের মৃত্যু দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর নীরব প্রস্থান আবারও মনে করিয়ে দেয়—শিল্পীরা চলে গেলেও তাঁদের সৃষ্টি ও স্মৃতি মানুষের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকে।
মন্তব্য করুন