চলচ্চিত্র সাংবাদিক ও গবেষক: ফাহিম শাহরিয়ার রুমি
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাঁদের অবদান একাধিক ক্ষেত্রে ছড়িয়ে আছে। তাঁদেরই একজন কিংবদন্তি শিল্পী Fateh Lohani। তিনি ছিলেন একাধারে অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক, নাট্যকার, অনুবাদক, সাংবাদিক ও আবৃত্তিকার। তাঁর জন্মদিন স্মরণ করা মানে কেবল একজন শিল্পীকে স্মরণ করা নয়, বরং বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও গণমাধ্যমের প্রারম্ভিক বিকাশের ইতিহাসকে স্মরণ করা।
১৯২০ সালের ১২ মার্চ তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের সিরাজগঞ্জ জেলার কাউলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ফতেহ লোহানী। তাঁর পিতা আবু ইউসুফ মোহাম্মদ সিদ্দিক হোসেন খান লোহানী এবং মাতা ফাতেমা খানম লোহানী—দুজনেই সাহিত্য ও সংস্কৃতিপ্রেমী ছিলেন। পারিবারিক পরিবেশেই তাঁর শিল্প ও সাহিত্যচর্চার ভিত্তি তৈরি হয়।
পরিবারের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ছিল বেশ শক্তিশালী। তাঁর ছোট ভাই Fazle Lohani পরবর্তীতে বাংলাদেশের টেলিভিশনের জনপ্রিয় উপস্থাপক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। ফলে ছোটবেলা থেকেই বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন ফতেহ লোহানী।
ফতেহ লোহানীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় কলকাতায়। তিনি St. Mary’s Cathedral Mission High School থেকে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করেন। পরে Ripon College (বর্তমান সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) থেকে আইএ ও বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্রজীবনেই তাঁর নাট্যচর্চা শুরু হয়। কলেজ মঞ্চে বাংলা ও ইংরেজি নাটকে অভিনয় করতে গিয়ে নাট্যাভিনয়ের প্রতি গভীর আগ্রহ জন্মায়।
১৯৫০ সালে তিনি লন্ডনে গিয়ে নাট্য প্রযোজনার ওপর দুই বছরের প্রশিক্ষণ নেন। পাশাপাশি তিনি British Film Institute-এ চলচ্চিত্র বিষয়েও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা তাঁর পরবর্তী চলচ্চিত্র নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
ফতেহ লোহানীর কর্মজীবন শুরু হয় সাহিত্য ও সাংবাদিকতার মাধ্যমে। ১৯৪৯ সালে তিনি “আগত্যা” নামের একটি সাহিত্য সাময়িকীর সঙ্গে যুক্ত হন। একই সময়ে তিনি Radio Pakistan-এর করাচি কেন্দ্রে কাজ শুরু করেন এবং পরবর্তীতে BBC-এর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
রেডিও ও সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা তাঁর ভাষা, উচ্চারণ ও উপস্থাপনা দক্ষতাকে সমৃদ্ধ করে। ১৯৫৪ সালে তিনি ঢাকায় ফিরে এসে চলচ্চিত্র, নাটক ও রেডিও জগতে সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করেন এবং দ্রুতই পূর্ব পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে ফতেহ লোহানীর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। Bangladesh Film Development Corporation প্রতিষ্ঠার পর তিনি প্রথম দিকের চলচ্চিত্র পরিচালকদের একজন ছিলেন।
তাঁর পরিচালিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে—
এর মধ্যে আসিয়া চলচ্চিত্রটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। গ্রামীণ জীবন, সামাজিক বাস্তবতা ও মানবিক সম্পর্কের গভীর উপস্থাপনা দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল।
পরিচালনার পাশাপাশি তিনি বহু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। সংযত অভিব্যক্তি, বাস্তবধর্মী সংলাপ ও চরিত্রের গভীরতা তাঁর অভিনয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি নিজেকে একজন শক্তিশালী চরিত্রাভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি নাটক ও সাহিত্যেও ফতেহ লোহানীর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে রয়েছে—
নিভৃত সংলাপ, দূর থেকে কাছে এবং সাগর দোলা।
এছাড়াও তিনি পাশ্চাত্যের বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম বাংলায় অনুবাদ করেন। যেমন—
এই অনুবাদগুলো বাংলা নাট্য ও সাহিত্য জগতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।
ফতেহ লোহানী ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি অভিনয়, চলচ্চিত্র পরিচালনা, লেখালেখি, অনুবাদ, আবৃত্তি এবং সাংবাদিকতা—সব ক্ষেত্রেই সমান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। রেডিও অনুষ্ঠান প্রযোজনা থেকে শুরু করে সংবাদ পাঠ এবং নাট্যাভিনয়—সবখানেই ছিল তাঁর স্বতন্ত্র উপস্থিতি।
তিনি যখন কাজ শুরু করেন, তখন বাংলা চলচ্চিত্র শিল্প ছিল একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে। প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তিনি শিল্পমানসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাণের চেষ্টা করেছেন। এই প্রচেষ্টাই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের ভিত্তি শক্ত করতে সহায়তা করে।
১৯৭৫ সালের ১২ এপ্রিল চট্টগ্রামের কাপ্তাইয়ে কুয়াশা চলচ্চিত্রের শুটিং চলাকালীন ফতেহ লোহানীর মৃত্যু হয়। তাঁর অকাল মৃত্যু বাংলা চলচ্চিত্র জগতের জন্য বড় ক্ষতি ছিল।
তবে তাঁর সৃষ্টিকর্ম আজও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিল্পমানসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাণের যে প্রচেষ্টা তিনি করেছিলেন, তা আজও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের অনুপ্রাণিত করে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ফতেহ লোহানী ছিলেন সেই প্রজন্মের শিল্পীদের একজন, যারা চলচ্চিত্র, নাটক, সাহিত্য ও সাংবাদিকতাকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়েছিলেন।
তাঁর কাজের মধ্যে আধুনিকতা, সামাজিক সচেতনতা এবং শিল্পের প্রতি গভীর নিষ্ঠা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। বাংলা চলচ্চিত্রের প্রাথমিক যুগে তিনি যে সৃজনশীলতার বীজ বপন করেছিলেন, সেই বীজ থেকেই পরবর্তীকালে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশ ঘটেছে।
ফতেহ লোহানী কেবল একজন অভিনেতা বা পরিচালক নন; তিনি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। তাঁর শিল্পচেতনা আগামী প্রজন্মের শিল্পীদের পথ দেখিয়ে যাবে।
মন্তব্য করুন