চলচ্চিত্র সাংবাদিক ও গবেষক: ফাহিম শাহরিয়ার রুমি
বাংলা চলচ্চিত্রে সামাজিক বাস্তবতা ও মানবিক সংকটকে গভীর শিল্পরূপে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে Rajen Tarafdar একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। তাঁর নির্মিত Palank (১৯৭৫) শুধু একটি গল্পনির্ভর চলচ্চিত্র নয়, বরং প্রতীক ও শ্রেণিচেতনার সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে নির্মিত এক অনন্য শিল্পকর্ম।
ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি Narendranath Mitra-এর ছোটগল্প অবলম্বনে তৈরি। ১২৮ মিনিটের এই বাংলা ভাষার সিনেমা দেশভাগ-পরবর্তী সমাজ বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে নির্মিত, যেখানে মানুষের পরিচয়, শ্রেণি বিভাজন ও সম্পদের প্রশ্নকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
চলচ্চিত্রটির মূল কাহিনি আবর্তিত হয়েছে রাজমোহন ও মকবুলকে ঘিরে। রাজমোহন চরিত্রে অভিনয় করেছেন Utpal Dutt, যিনি দেশভাগের পরও পূর্ববাংলায় থেকে যাওয়া এক জমিদার মানসিকতার প্রতিনিধি। অপরদিকে দরিদ্র মুসলমান চরিত্র মকবুলের ভূমিকায় আছেন Anwar Hossain।
একটি বিলাসবহুল পালঙ্ককে কেন্দ্র করে গল্পের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এটি একসময় রাজমোহনের সম্পদ হলেও পরে মকবুল সেটি কিনে নেয়। এই পালঙ্ক ধীরে ধীরে শুধু একটি আসবাব নয়, বরং শ্রেণি-সংগ্রাম, সামাজিক মর্যাদা ও আত্মপরিচয়ের প্রতীকে রূপ নেয়।
গ্রামের উচ্চবিত্ত সমাজ মকবুলের এই উত্থান মেনে নিতে পারে না, ফলে তৈরি হয় সামাজিক সংঘাত। অন্যদিকে রাজমোহনও নিজের সিদ্ধান্তে অনুতপ্ত হয়ে পালঙ্কটি ফেরত পেতে চান।
উৎপল দত্ত তাঁর অভিনয়ে জমিদারি অহং, সংকট ও মানসিক ভাঙনকে দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন। অন্যদিকে আনোয়ার হোসেন মকবুল চরিত্রে দারিদ্র্যের মধ্যেও আত্মমর্যাদার শক্ত অবস্থান তুলে ধরেছেন। এছাড়া Sandhya Roy-এর অভিনয়ও চলচ্চিত্রে গভীরতা যোগ করেছে।
চলচ্চিত্রটিতে পালঙ্ক একটি বহুমাত্রিক প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে—
এছাড়া জমিদার বনাম নিম্নবিত্তের দ্বন্দ্ব এবং ধর্মীয় পরিচয়ের আড়ালে শ্রেণিগত বৈষম্য চলচ্চিত্রটিতে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
পরিচালক রাজেন তরফদারের নির্মাণশৈলীতে রয়েছে—
বাস্তবধর্মী চিত্রায়ণ, প্রতীকী ভাষার ব্যবহার, সংলাপের গভীরতা এবং গ্রামীণ জীবনের নিখুঁত উপস্থাপন। ক্যামেরা ও দৃশ্যায়নে আবেগ ও বাস্তবতার মেলবন্ধন চলচ্চিত্রটিকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা।
মুক্তির পর চলচ্চিত্রটি সমালোচকদের ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। এটি ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ বাংলা চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং BFJA Awards-এ সেরা চলচ্চিত্র ও সঙ্গীতের সম্মান লাভ করে।
‘পালঙ্ক’ শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়—এটি দেশভাগ-পরবর্তী সমাজ বাস্তবতার একটি দলিল। ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে এটি বাংলা আর্ট ফিল্ম ধারায় গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
সব মিলিয়ে ‘পালঙ্ক’ এমন একটি চলচ্চিত্র, যেখানে একটি সাধারণ খাটকে কেন্দ্র করে মানুষের আত্মমর্যাদা, শ্রেণি-সংগ্রাম ও সামাজিক দ্বন্দ্ব গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। সময়ের সঙ্গে কিছুটা আড়ালে চলে গেলেও এর শিল্পমান ও প্রাসঙ্গিকতা আজও অটুট।
মন্তব্য করুন