
আগামী এক দশকের মধ্যেই বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা শিল্প-পূর্ব সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের গুরুত্বপূর্ণ সীমা অতিক্রম করতে পারে—এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি)। সংস্থাটির সদ্য প্রকাশিত এমিশনস গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৫–এ বলা হয়েছে, বর্তমান গতিপথ অব্যাহত থাকলে জলবায়ু সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পূর্বাভাস অপ্রত্যাশিত না হলেও তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কারণ এই সীমা অতিক্রম করলে খরা, বন্যা, তীব্র তাপপ্রবাহ ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগ বহুগুণে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমাতে বিশ্ব এখনো প্রয়োজনীয় অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।
ইউএনইপির জলবায়ু পরিবর্তন বিভাগের প্রধান মার্টিন ক্রাউসে বলেন, বারবার সতর্ক করার পরও বিশ্বজুড়ে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ রেকর্ড মাত্রায় পৌঁছেছে। ফলে এমন পূর্বাভাস অস্বাভাবিক নয়, তবে এটি মানবজাতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ দুই শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব এখন অন্তত ২০ লাখ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এসব গ্যাস পৃথিবীর চারপাশে তাপ আটকে রেখে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ইউএনইপি জানায়, দেশগুলো তাদের বর্তমান জলবায়ু প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করলেও শতাব্দীর শেষ নাগাদ পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ২ দশমিক ৩ থেকে ২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা বৈশ্বিক জলবায়ু ব্যবস্থাকে গুরুতরভাবে অস্থিতিশীল করে তুলবে।
বিশেষজ্ঞরা ব্যাখ্যা করেন, কোনো একক বছরে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সীমা অতিক্রম করাই চূড়ান্ত ব্যর্থতা নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি গড় তাপমাত্রাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই দীর্ঘমেয়াদি গড় তাপমাত্রা আগামী ১০ বছরের মধ্যেই ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যেতে পারে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির মধ্যে রাখতে হলে ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক নিঃসরণ প্রায় ৫৫ শতাংশ কমাতে হবে, যা বর্তমান প্রতিশ্রুতির তুলনায় অনেক বেশি। এমনকি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা ধরে রাখতেও নিঃসরণ কমাতে হবে অন্তত ৩৫ শতাংশ।
ইউএনইপি সতর্ক করে বলেছে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এই সীমা অতিক্রম যত কম এবং যত স্বল্প সময়ের জন্য হয়, তা নিশ্চিত করা। কারণ উষ্ণতার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে মানুষের জীবন, অর্থনীতি ও প্রকৃতি অনেকাংশে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সংকট মোকাবিলায় জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর সংস্কার জরুরি।
ইতিবাচক দিক হলো, প্যারিস চুক্তির পর গত এক দশকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং এর খরচও কমেছে। ইউএনইপি বলছে, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও জ্ঞান ইতোমধ্যে আমাদের হাতে রয়েছে—এখন কেবল দরকার কার্যকর রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
মন্তব্য করুন