চলচ্চিত্র সাংবাদিক ও গবেষক: ফাহিম শাহরিয়ার রুমি
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে খান আতাউর রহমান এক বহুমাত্রিক শিল্পী হিসেবে সুপরিচিত। তিনি অভিনেতা, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, গীতিকার ও সুরকার—সব ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। বিশেষ করে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো বাংলা সিনেমার ধারাকে সমৃদ্ধ করেছে।
তাঁর পরিচালিত জনপ্রিয় চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘সুজন সখী’, যা ১৯৭৫ সালে মুক্তি পেয়ে দর্শকদের কাছে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি ক্লাসিক রোমান্টিক সামাজিক চলচ্চিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।
১৯৭০-এর দশকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে গ্রামীণ জীবনভিত্তিক গল্প এবং রোমান্টিক সামাজিক নাটকের একটি শক্তিশালী ধারা গড়ে ওঠে। এই ধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ ছিল খান আতাউর রহমান পরিচালিত ‘সুজন সখী’।
চলচ্চিত্রটি ১৯৭৫ সালের ১০ অক্টোবর মুক্তি পায় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
এই ছবিতে অভিনয় করেন—
এছাড়া পরিচালক খান আতাউর রহমান নিজেও একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন।
চলচ্চিত্রটির গল্প ও সংলাপ লিখেছেন আমজাদ হোসেন, আর চিত্রনাট্য রচনা করেন খান আতাউর রহমান নিজেই। সংগীত পরিচালনার দায়িত্বও ছিল তাঁর ওপর, যা তাঁর বহুমুখী শিল্পীসত্তার পরিচয় বহন করে।
‘সুজন সখী’ মূলত একটি গ্রামীণ প্রেমকাহিনি, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও সামাজিক বাস্তবতা।
গল্পের শুরু হয় দুই ভাইয়ের মধ্যে পারিবারিক বিরোধ থেকে। বড় ভাইয়ের স্ত্রীর কারণে পরিবারে অশান্তি তৈরি হয় এবং ছোট ভাইকে পরিবার থেকে আলাদা হয়ে যেতে হয়।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই গড়ে ওঠে সুজন ও সখীর প্রেমের সম্পর্ক। কিন্তু পারিবারিক বিরোধ, সামাজিক বাধা এবং সম্পর্কের জটিলতা তাদের জীবনে নানা সংকট তৈরি করে।
চলচ্চিত্রের শেষাংশে দেখানো হয়, মানবিক সম্পর্ক ও ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত পারিবারিক বিভেদকে অতিক্রম করতে সক্ষম।
এই কাহিনির মাধ্যমে গ্রামীণ সমাজের মূল্যবোধ, পারিবারিক বন্ধন এবং মানুষের আবেগময় জীবনকে বাস্তবধর্মীভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
‘সুজন সখী’ চলচ্চিত্রটি গ্রামীণ জীবনের আবেগ ও বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে নির্মিত। ছবিতে গ্রামের পরিবেশ, লোকসংস্কৃতি, পারিবারিক সম্পর্ক এবং প্রেমের অনুভূতিকে সহজ ও মানবিক ভঙ্গিতে উপস্থাপন করা হয়েছে।
খান আতাউর রহমান তাঁর নির্মাণশৈলীতে লোকজ সংগীত, আবেগঘন সংলাপ এবং নাটকীয় দৃশ্যের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী চলচ্চিত্রভাষা তৈরি করেন।
চলচ্চিত্রটির সংগীতও দর্শকদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়। বিশেষ করে “সব সখীরে পার করিতে” গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই গানের জন্য শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন ও আব্দুল আলীম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।
চলচ্চিত্রটির অভিনয়শিল্পীরা তাঁদের চরিত্রগুলোকে জীবন্ত করে তুলতে সফল হয়েছেন।
ফারুক ‘সুজন’ চরিত্রে এক সংবেদনশীল ও প্রেমময় যুবকের চিত্র তুলে ধরেন। অন্যদিকে কবরী সারোয়ার ‘সখী’ চরিত্রে আবেগঘন অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের মন জয় করেন।
রওশন জামিলও পারিবারিক দ্বন্দ্বভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে শক্তিশালী অভিনয় উপহার দেন।
বিশেষ করে ফারুক ও কবরীর জুটি এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দর্শকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
বাংলা চলচ্চিত্রে ‘সুজন সখী’ একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রভাব ফেলেছে।
১৯৯৪ সালে পরিচালক শাহ আলম কিরণ একই কাহিনি নিয়ে একটি রঙিন চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, যেখানে অভিনয় করেন সালমান শাহ ও শাবনুর।
‘সুজন সখী’ নির্মাণের সময় খান আতাউর রহমান আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছিলেন। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, এই চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য তিনি ব্যক্তিগত সম্পদ পর্যন্ত বিক্রি করেছিলেন।
তবে মুক্তির পর ছবিটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং বক্স অফিসে সফলতা লাভ করে।
সব দিক বিবেচনায় ‘সুজন সখী’ বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। গ্রামীণ সমাজের বাস্তবতা, প্রেমের মানবিক আবেগ এবং পারিবারিক সম্পর্কের গভীরতাকে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এই ছবিতে।
খান আতাউর রহমান তাঁর এই নির্মাণের মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন—বাংলা চলচ্চিত্র শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের আবেগের গভীর শিল্পভাষাও হতে পারে।
মন্তব্য করুন