চলচ্চিত্র সাংবাদিক ও গবেষকঃ ফাহিম শাহরিয়ার রুমি
বাংলাদেশের সমসাময়িক চলচ্চিত্রের মধ্যে গ্রামীণ সমাজ, লোকজ সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনসংগ্রামের ছবিগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি হলো ‘মৃত্তিকা মায়া’। ২০১৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই চলচ্চিত্রের পরিচালক, কাহিনি, চিত্রনাট্য ও সংলাপ রচনা করেছেন গাজী রাকায়েত। ছবিটি গ্রামীণ জীবনের বাস্তবতা এবং ঐতিহ্যবাহী পেশার সংকটকে সংবেদনশীলভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
‘মৃত্তিকা মায়া’ মূলত বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের ঐতিহ্যবাহী পেশা—মৃৎশিল্পকে কেন্দ্র করে নির্মিত। গ্রামবাংলার কুমোর সম্প্রদায় প্রাচীনকাল থেকে মাটির নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছে। আধুনিকতার প্রভাবে এই পেশা ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে।
পরিচালক গাজী রাকায়েত একজন মঞ্চ ও টেলিভিশন অভিনেতা হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করার পর এই চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তিনি নির্মাণে নিজের ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও অর্থ বিনিয়োগও করেছেন।
চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্র খিরমোহন, একজন বৃদ্ধ কুমোর, যিনি সারা জীবন কঠোর পরিশ্রম করে মৃৎশিল্পের কারখানা গড়ে তুলেছেন। তার দুই ছেলে শহরে বসবাস করে এবং গ্রামীণ ঐতিহ্য ধরে রাখতে আগ্রহী নয়।
খিরমোহনের নাতনি পদ্মা এবং পালকপুত্র বৈশাখ তার স্বপ্ন ও ঐতিহ্য রক্ষায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। গল্পটি আধুনিক নগরজীবনের আকর্ষণ এবং গ্রামীণ ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার রক্ষার সংগ্রামের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে এগিয়ে চলে।
চলচ্চিত্রের শক্তিশালী অভিনয় হলো এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য:
চলচ্চিত্রের দৃশ্যায়ন বাস্তবধর্মী ও শিল্পসম্মত। গ্রামীণ জীবন, নদী, মাঠ, মাটির ঘর এবং কুমোরের চাকা অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। লোকসঙ্গীত এবং প্রাকৃতিক শব্দ ব্যবহারে পরিবেশের আবেগ আরও গভীর হয়েছে।
‘মৃত্তিকা মায়া’ ২০১৩ সালের বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ১৭টি বিভাগে পুরস্কার অর্জন করে। আন্তর্জাতিক সাফল্যও এসেছে; SAARC Film Festival-এ রৌপ্য পদক জয় করে।
‘মৃত্তিকা মায়া’ শুধু কুমোর পরিবারের গল্প নয়, এটি গ্রামীণ সমাজের পরিবর্তন, ঐতিহ্যবাহী পেশার সংকট এবং মানুষের সংগ্রামের প্রতীক। গাজী রাকায়েতের সংবেদনশীল পরিচালনায় চলচ্চিত্রটি গ্রামীণ সংস্কৃতি ও জীবনসংগ্রামের শক্তিশালী দলিল হিসেবে বিবেচিত।
মন্তব্য করুন