
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য বাংলাদেশে অফিসিয়াল পর্যবেক্ষক পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে চীন। কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে চীন সরকার জানিয়েছে, নির্বাচনে অংশ নিতে দুইজন পর্যবেক্ষক পাঠাতে আগ্রহী তারা।
সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে জানা গেছে, নির্ধারিত ভোটের আগেই চীনা পর্যবেক্ষকরা বাংলাদেশে পৌঁছাবেন। তারা ভোটগ্রহণসহ পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়া সরাসরি পর্যবেক্ষণ করবেন। এ কাজে ঢাকায় অবস্থিত চীনা দূতাবাসের কর্মকর্তারাও একটি সমন্বিত টিম হিসেবে সহযোগিতা করবেন।
বাংলাদেশ ও চীনের কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এর আগে ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো চীন তিনজন অফিসিয়াল পর্যবেক্ষক পাঠিয়েছিল। সে সময় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষক দল না পাঠালেও চীন, রাশিয়া ও জাপানের মতো দেশগুলো সীমিত পরিসরে উপস্থিতি জানিয়েছিল।
এবারও ছোট পরিসরে হলেও অফিসিয়াল পর্যবেক্ষক পাঠানোর মাধ্যমে বাংলাদেশে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি চীনের আগ্রহের ধারাবাহিকতা বজায় থাকছে। যদিও অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি চীনের পররাষ্ট্র নীতির অন্যতম ভিত্তি, তবুও নির্বাচন পর্যবেক্ষণে তাদের অংশগ্রহণ নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে।
সম্প্রতি চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন সম্পূর্ণভাবে দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়। চীন অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না এবং বাংলাদেশের জনগণ ও অন্তর্বর্তী সরকারের সক্ষমতার ওপর আস্থা রাখে। একই সঙ্গে তারা একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন প্রত্যাশা করে।
সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের নির্বাচনে চীনা পর্যবেক্ষকরা ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াকে ‘সুষ্ঠু, অবাধ ও স্বচ্ছ’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। তবে দীর্ঘদিন ধরে একদলীয় শাসনব্যবস্থায় পরিচালিত চীনের পক্ষ থেকে গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের বিষয়টি মূলত কূটনৈতিক গুরুত্বের ওপর নির্ভর করে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী বিদেশি পর্যবেক্ষকরা নির্বাচনের সব ধাপ—প্রাক-নির্বাচনী প্রস্তুতি, প্রচার কার্যক্রম, ভোটগ্রহণ, ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণার পর্যায় পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। এ লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অ্যাক্রেডিটেশন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এ সিদ্ধান্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই), বাণিজ্য, ঋণ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অংশীদার। ২০২৪ সালের পর থেকে চীন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা। সর্বশেষ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গেও বৈঠক করেন চীনা রাষ্ট্রদূত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন পর্যবেক্ষক পাঠানো চীনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত আগ্রহেরই অংশ, যাতে নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করা যায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিতব্য এ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং আন্তর্জাতিক সমর্থনের গুরুত্ব বেড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে চীনের মতো প্রভাবশালী দেশের পর্যবেক্ষক পাঠানো নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও আন্তর্জাতিক আস্থাকে জোরদার করতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ওবায়দুল হক বলেন, চীন তাদের কূটনৈতিক আচরণে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনছে এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় আরও দৃশ্যমান ভূমিকা রাখতে আগ্রহী হচ্ছে। বাংলাদেশের নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠানোর মাধ্যমে তারা নিজেদের উপস্থিতি জোরালো করতে এবং ভবিষ্যৎ সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে চায়।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন প্রকল্পে চীনের বড় বিনিয়োগ থাকায় দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি পশ্চিমা দেশগুলোর প্রভাবের বিপরীতে দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতেও নির্বাচন পর্যবেক্ষণে চীনের আগ্রহ বাড়ছে।
মন্তব্য করুন