
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সমর্থন কেন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ—সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছে সরকারের প্রেস উইং।
রোববার (১৮ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, সংস্কারভিত্তিক গণভোটে সরকারের অবস্থান নিরপেক্ষতা লঙ্ঘন নয়; বরং এটি অন্তর্বর্তী সরকারের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্বেরই অংশ।
প্রেস উইং জানায়, অন্তর্বর্তী সরকার কেবল দৈনন্দিন রাষ্ট্র পরিচালনা বা নির্বাচন আয়োজনের জন্য গঠিত হয়নি। দীর্ঘদিনের শাসনব্যর্থতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে এই সরকার গঠিত হয়েছে, যার প্রধান দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রীয় সংস্কার নিশ্চিত করা এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করা।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, অধ্যাপক ইউনূস গত দেড় বছরে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী ও তরুণদের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে যে সংস্কার প্রস্তাবনা তৈরি করেছেন, বর্তমান সংস্কার প্যাকেজ তারই ফল। ফলে এই সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
প্রেস উইংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চায় সরকারপ্রধানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নীরব থাকার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বরং নেতারা জনগণের সামনে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করবেন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জনগণের ওপর ছেড়ে দেবেন—এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক রীতি।
গণভোটের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো—
ভোটারদের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সুযোগ
বিরোধী মতের উন্মুক্ত প্রচারণা
স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য ভোট প্রক্রিয়া
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই তিনটি শর্তই বজায় রয়েছে বলে দাবি করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের চলমান সংস্কার প্রক্রিয়া কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার বাস্তব প্রতিক্রিয়া। এই অবস্থায় সংস্কারের নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তি হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার নীরব থাকা দায়িত্বহীনতার শামিল হতো।
যে অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা সংস্কার প্রক্রিয়া থেকে আসে, তাদের পক্ষে সংস্কারের পক্ষে কথা বলা পক্ষপাত নয়; বরং এটি তাদের প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা।
প্রেস উইং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দেশের উদাহরণ তুলে ধরে জানায়, যুক্তরাজ্য, স্কটল্যান্ড, তুরস্ক, ফ্রান্সসহ বহু দেশে সরকারপ্রধানরা গুরুত্বপূর্ণ গণভোটে প্রকাশ্যে পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এসব ঘটনাকে কখনোই গণতন্ত্রবিরোধী হিসেবে দেখা হয়নি; বরং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের অংশ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের গণভোটের ফলাফলের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো রাজনৈতিক বা নির্বাচনী স্বার্থ জড়িত নয়। সংস্কার গৃহীত বা প্রত্যাখ্যাত হলে তার বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকবে ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকারের ওপর।
অধ্যাপক ইউনূস ও তাঁর উপদেষ্টাদের দায়িত্ব সময়সীমাবদ্ধ ও অন্তর্বর্তী হওয়ায়, প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করা হয়।
জেলা পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম প্রসঙ্গে প্রেস উইং জানায়, এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য হলো জনগণকে সংস্কারের বিষয়বস্তু সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া, যাতে ভুল তথ্য বা বিভ্রান্তি ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত না করে।
এ ধরনের সরকারি সম্পৃক্ততাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনৈতিক প্রচারণা বলা যায় না বলেও উল্লেখ করা হয়।
প্রেস উইংয়ের মতে, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সমর্থন নয়, বরং দ্বিধা ও নীরবতা। সংস্কারের পক্ষে প্রধান উপদেষ্টার অবস্থান—
অন্তর্বর্তী সরকারের ম্যান্ডেটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ
প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তার প্রতিফলন
আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ
জনগণের প্রতি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বহিঃপ্রকাশ
শেষ পর্যন্ত গণভোটের সিদ্ধান্ত জনগণের হাতেই থাকবে—এটাই গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
মন্তব্য করুন