চলচ্চিত্র সাংবাদিক ও গবেষক: ফাহিম শাহরিয়ার রুমি
১৩ মার্চ ২০২৬, ১১:৩৩ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ২১ জন

বিচ্ছেদের নদী, স্মৃতির ঘাট: আশুতোষ সুজনের ‘দেশান্তর’

বিচ্ছেদের নদী, স্মৃতির ঘাট: আশুতোষ সুজনের ‘দেশান্তর’
৩১

 

চলচ্চিত্র সাংবাদিক ও গবেষক: ফাহিম শাহরিয়ার রুমি

১৯৪৭ সালের ভারত-পাকিস্তান বিভাজন উপমহাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ও বেদনাময় অধ্যায়। সেই সময়কার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফলে কোটি কোটি মানুষের জীবন বদলে যায়। পরিবার বিচ্ছিন্নতা, ভৌগোলিক পরিবর্তন, পরিচয়ের সংকট ও মানসিক দ্বন্দ্ব—এসব অভিজ্ঞতা আজও ইতিহাসের স্মৃতি হয়ে রয়েছে। এই বাস্তবতাকেই কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ‘দেশান্তর’, যা ইতিহাস ও মানবিক অনুভূতির মিশেলে নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচিত।

বাংলাদেশি নির্মাতা আশুতোষ সুজন পরিচালিত এই সিনেমাটি মূলত তাঁর বড় পর্দায় অভিষেক। টেলিভিশন নাটক ও বিজ্ঞাপন নির্মাণে পরিচিত এই নির্মাতা সরকারি অনুদানে ছবিটি নির্মাণ করেন। ২০২২ সালের ১১ নভেম্বর মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর দর্শক ও সমালোচকদের মধ্যে আলোচনার জন্ম দেয়।

উপন্যাস থেকে চলচ্চিত্রে

‘দেশান্তর’ সিনেমার কাহিনি গড়ে উঠেছে কবি ও সাহিত্যিক নির্মলেন্দু গুণের একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে। তাঁর লেখায় দেশভাগ-পরবর্তী সমাজ, মানুষের আবেগ এবং বাস্তব জীবনের বেদনা বারবার উঠে এসেছে।

পরিচালক আশুতোষ সুজন গল্পটিকে চলচ্চিত্রে রূপ দিতে গিয়ে ইতিহাসের বাস্তবতা এবং চরিত্রের মানবিক দিককে গুরুত্ব দিয়েছেন। সাধারণত দেশভাগের গল্পে মানুষ কীভাবে দেশ ছেড়ে চলে যায়, সেটিই বেশি দেখা যায়। কিন্তু ‘দেশান্তর’-এ এমন মানুষের গল্প বলা হয়েছে, যারা দেশ ছাড়েনি; বরং জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসা ও বিশ্বাসে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এই দৃষ্টিভঙ্গিই ছবিটিকে কেবল ঐতিহাসিক নয়, মানবিক চলচ্চিত্র হিসেবেও আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।

ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট

চলচ্চিত্রটির পটভূমি ১৯৪৭ সালের দেশভাগ। সেই সময় ধর্ম ও রাজনীতির দ্বন্দ্বে উপমহাদেশে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়। লাখো মানুষকে জন্মভূমি ছেড়ে নতুন দেশে আশ্রয় নিতে হয়।

এই বাস্তবতার মধ্যেই চলচ্চিত্রে দেখানো হয়েছে পরিবার বিচ্ছিন্নতা, ভৌগোলিক বিভাজন এবং মানুষের মনে জন্মভূমির প্রতি গভীর টান। গল্পটি মূলত পূর্ব বাংলা ও ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষদের জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ইতিহাসের ঘটনাকে কেন্দ্র করলেও চলচ্চিত্রের প্রধান শক্তি মানবিক অনুভূতি ও পরিচয়ের সংকট।

চরিত্র ও অভিনয়

‘দেশান্তর’ চলচ্চিত্রে শক্তিশালী একটি অভিনয়শিল্পী দল রয়েছে। এতে অভিনয় করেছেন মৌসুমী, আহমেদ রুবেল, ইয়াশ রোহান, রোদেলা টাপুর, মামুনুর রশীদ, মোমেনা চৌধুরী ও শুভাশিস ভৌমিকসহ অনেকে।

মৌসুমী অভিনীত অন্নপূর্ণা চরিত্রটি সিনেমার অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র। দেশভাগের অস্থির সময়ে তিনি জন্মভূমি ছেড়ে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তার এই দৃঢ়তা ও দেশপ্রেম চলচ্চিত্রের মূল থিমকে শক্তভাবে তুলে ধরে।

চরিত্রগুলোর মাধ্যমে শুধু ইতিহাস নয়, বরং প্রেম, পরিবার, আত্মত্যাগ ও মানসিক দ্বন্দ্বের গল্পও তুলে ধরা হয়েছে। বাস্তবধর্মী চরিত্র নির্মাণ দর্শকদের সঙ্গে গল্পের সংযোগ তৈরি করে।

নির্মাণশৈলী ও চলচ্চিত্রভাষা

২ ঘণ্টা ৩ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই চলচ্চিত্রটি নাটকীয় ও ঐতিহাসিক ধারার। পরিচালক ক্লাসিক্যাল চলচ্চিত্রভাষা ব্যবহার করে গল্পটি নির্মাণ করেছেন।

ছবির দৃশ্যায়নে ১৯৪০-এর দশকের পরিবেশ ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। গ্রামবাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সীমান্তবর্তী জনপদের আবহ এবং ঐ সময়ের সামাজিক বাস্তবতা চলচ্চিত্রের দৃশ্য বিন্যাসে প্রতিফলিত হয়েছে।

দীর্ঘ শট, ধীরগতির গল্প বলার ধারা এবং আবহসংগীত—এসব উপাদান দর্শককে সেই সময়ের অনুভূতির মধ্যে নিয়ে যেতে সহায়তা করে।

দেশ, পরিচয় ও আবেগের গল্প

‘দেশান্তর’-এর মূল ভাবনা মানুষের জন্মভূমির প্রতি গভীর সম্পর্ককে কেন্দ্র করে। গল্পের চরিত্ররা এক কঠিন সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়—কেউ দেশ ছাড়ে, কেউ থেকে যায়।

চলচ্চিত্রটি দেখায়, একটি দেশ শুধু ভৌগোলিক সীমানা নয়; এটি মানুষের স্মৃতি, সংস্কৃতি, পরিবার ও পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই বিচ্ছেদের বাস্তবতাতেও মানুষের মনে জন্মভূমির প্রতি অটুট ভালোবাসা রয়ে যায়।

মুক্তি ও সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া

সরকারি অনুদানে নির্মিত এই সিনেমাটি মুক্তির সময় সীমিত সংখ্যক প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়। শুরুতে ঢাকার যমুনা ব্লকবাস্টার ও লায়ন সিনেমাসে ছবিটি প্রদর্শিত হয়েছিল।

বাণিজ্যিক ধারার বাইরে হওয়ায় কিছু দর্শকের কাছে ছবির গতি ধীর মনে হলেও চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে এটি ইতিহাসকে সৎ ও সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরেছে।

উপসংহার

সব মিলিয়ে ‘দেশান্তর’ একটি চিন্তাশীল ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র। দেশভাগের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই সিনেমা মানুষের আবেগ, পরিচয় ও দেশপ্রেমের গভীর প্রশ্নগুলোকে সামনে আনে।

এটি শুধু একটি সিনেমা নয়; বরং উপমহাদেশের ইতিহাসের এক বেদনাময় সময়ের মানবিক দলিল। ইতিহাস ও অনুভূতির সমন্বয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্র বাংলাদেশের চলচ্চিত্রভাণ্ডারে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মির্জা আব্বাসের অসুস্থতা নিয়ে ‘মায়াকান্না’ বন্ধের আহ্বান আজাদ মজুমদারের

একদিনের ব্যবধানে আবারও কমলো স্বর্ণের দাম

ইরান ইসরায়েলকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল: দাবি ট্রাম্পের

“তদবির নয়, যোগ্যতার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেবে সরকার: স্থানীয় সরকারমন্ত্রী”

ইতালি নেওয়ার কথা বলে লিবিয়ায় পাঠিয়ে ১৬ লাখ টাকা আত্মসাৎ, প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন

সংসদে জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে: নাহিদ ইসলাম

পাকিস্তানের কাছে বড় হার বাংলাদেশের, সিরিজে সমতা

গাড়িওয়ালা: মানবিক সংগ্রাম ও স্বপ্নের চলচ্চিত্র

দেশভাগের ট্র্যাজেডি ও মানবিক সংকট—আকরাম খানের ‘খাঁচা’

বিচ্ছেদের নদী, স্মৃতির ঘাট: আশুতোষ সুজনের ‘দেশান্তর’

১০

নরসিংদী জেলা মডেল প্রেসক্লাবের উদ্যোগে এতিমদের সম্মানে দোয়া ও ইফতার মাহফিল

১১

গোপালগঞ্জে বিষ প্রয়োগ করে ঘেরের মাছ চুরি, প্রায় লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি

১২

শ্যামপুরে সরকারি নিয়ম অমান্য করে ওএমএস ডিলারের নামে চাল-আটা কালোবাজারির অভিযোগ

১৩

মুকসুদপুর রিপোর্টার্স ইউনিটির উদ্যোগে ঈদ উপহার বিতরণ

১৪

কয়রায় সড়ক দুর্ঘটনায় নববধুসহ ১২ জন নিহত

১৫

ভারতে পাচারের সময় যশোরে অর্ধকোটি টাকার স্বর্ণের বারসহ যুবক আটক

১৬

সংসদে কেবল বিরোধিতার রাজনীতি নয়, দরকার গঠনমূলক ভূমিকা

১৭

স্মরণে কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার ফতেহ লোহানী

১৮

অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী: মুক্তিযুদ্ধ, বীরাঙ্গনা ও মানবিক পুনর্জাগরণের চলচ্চিত্র

১৯

খান আতাউর রহমানের ‘সুজন সখী’: বাংলা চলচ্চিত্রে গ্রামীণ প্রেম ও সামাজিক বাস্তবতার এক অনন্য দলিল

২০