ডিজিটাল রূপান্তরের যুগে প্রযুক্তির সহায়তায় জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা (টিএফজিবিভি) একটি ক্রমবর্ধমান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা বিশেষ করে নারী এবং কন্যা শিশুরা অধিকতর সম্মুখীন হচ্ছে। ইউএনএফপিএ-এর তথ্যমতে, পৃথিবীজুড়ে প্রতি তিনজনে দুইজন নারী টেকনোলজি-সুবিধাভোগী জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতার শিকার হন এবং বাংলাদেশে এই হার ৮৯%।
এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে, আজ ময়মনসিংহে বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও এন্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি) এবং নিষ্ঠা উন্নয়ন সংঘ যৌথভাবে এক যৌথভাবে একটি মাল্টিস্টেকহোল্ডার সংলাপ আয়োজন করে যেখানে ডিজিটাল উন্নয়ন এবং প্রযুক্তির সহায়তায় জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ, প্রশমন এবং করণীয় বিষয়ে আলোচনা করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা) উম্মে হাবীবা মীরা। এ সংলাপ স্ট্রেনথেনিং রেজিলিয়েন্স এগেইনস্ট টেকনোলজি-ফেসিলিটেটেড জেন্ডার-বেইসড ভায়োলেন্স (টিএফজিবিভি) এন্ড প্রমোটিং ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়, যা নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড (সিইএফ) কর্মসূচির অধীনে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই প্রকল্পটির কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে জিএফএ কনসালটিং গ্রুপ এবং অর্থায়ন করছে সুইজারল্যান্ড এবং গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা।
সংলাপের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতার ধরন, প্রভাব এবং প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা প্রদান করা এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতিমালা বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা। এছাড়া, অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের প্রতিষ্ঠানে টেকনোলজি-সুবিধাভোগী সহিংসতা প্রতিরোধের জন্য জ্ঞান এবং জবাবদিহিতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণে উৎসাহিত করা এবং ডিজিটাল উন্নয়ন ও টিএফজিবিভি প্রতিরোধ বিষয়ে আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রেরণা দেওয়া।
সংলাপের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন নিষ্ঠা উন্নয়ন সংঘের নির্বাহী পরিচালক, স্বাধীন চৌধুরী, তিনি অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য এবং প্রত্যাশিত ফলাফল সম্পর্কে অংশগ্রহণকারীদের অবহিত করেন। তিনি সহিংসতার বিস্তৃতি, আইনি প্রতিক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা, তথ্য ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি এবং নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানের অভাবের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি জেলার স্থানীয় চিত্র, অগ্রগতি এবং সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন এবং পরিবর্তনের জন্য সংক্ষিপ্ত নীতিগত সুপারিশ তুলে ধরেন।
বিএনএনআরসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, এ এইচ এম বজলুর রহমান, প্রযুক্তির সহায়তায় জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা (টিএফজিবিভি) এবং ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট সম্পর্কিত ধারণা, ধরন, নেতিবাচক প্রভাব এবং কর্তব্য বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি কর্মশালার উদ্দেশ্য ও প্রত্যাশিত ফলাফল সম্পর্কে অংশগ্রহণকারীদের অবহিত করেন এবং ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট ও প্রযুক্তির সহায়তায় জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতার বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও ভয়াবহতা সম্পর্কে আলোচনা করেন।
এ অনুষ্ঠানে ১৬ জন ডেজিগনেটেড স্পিকার আলোচনা করেন এবং অন্যান্য অংশগ্রহণকারীরা মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। তাঁরা প্রযুক্তির মাধ্যমে সহিংসতা প্রতিরোধের জন্য বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম যেমন টিএফজিবিভি-র ধরন, প্রতিরোধ, প্রশমন ও করণীয় সম্পর্কে নিজেদের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। এছাড়াও, অংশগ্রহণকারীগণ টিএফজিবিভি প্রতিরোধে নতুন স্টেকহোল্ডারদের যেমন আইএসপি, কেবল নেটওয়ার্ক প্রতিনিধি, বিকাশ, রকেট এজেন্টদের বিষয়টি জানানোর উপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
অতিথিবৃন্দ ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট এবং টিএফজিবিভি বিষয়ে জনসচেতনতায় জোর দেন এবং সরকারের কার্যকর উদ্যোগ ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ হেল্পলাইন (০১৩২০০০০৮৮৮) ও ইমেইল (cybersupport.women@police.gov.bd) সম্পর্কে আলোচনা করেন। তারা সচেতনতার মাধ্যমে সহিংসতা কমানোর এবং একটি নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
প্রধান অতিথি ময়মনসিংহ জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা) উম্মে হাবীবা মীরা বলেন, প্রযুক্তির সহায়তায় জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা তথা নতুন নতুন বিষয় সম্পর্কে আমাদের সবাইকে জানতে হবে এবং এগুলো সম্পর্কে সকলকে জানানোর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। প্রযুক্তি বাদ দিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে পারব না; আমাদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ভুল তথ্য ও অপতথ্য কঠোর হাতে দমন করে সঠিক তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তা সত্যের জয় নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।” আইনি দিকের আলোচনায় উঠে আসে, দেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনসহ একাধিক আইন থাকলেও মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষিত সাইবার তদন্ত কর্মকর্তা এবং ভুক্তভোগীবান্ধব সহায়তা ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
প্রযুক্তির সহায়তায় সহিংসতা অনেক বাড়ছে- বাস্তবতায় পরিবার, স্কুল, গণমাধ্যম, এনজিও ও প্রশাসনকে একসাথে তিনি সমাজের সবাইকে এ বিষয়ে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই ধরনের কর্মকাণ্ডে পূর্ণ সহযোগিতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
মন্তব্য করুন