রাঙ্গামাটির পাহাড়জুড়ে শুরু হয়েছে বর্ণিল উৎসবের আয়োজন। পুরনো বছরের অতীতকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরের আগমন উপলক্ষে পার্বত্য জেলার সবচেয়ে বড় সামাজিক অনুষ্ঠান উদযাপন করা হচ্ছে। চাকমাদের বিজু, মারমাদের সাংগ্রাই, ত্রিপুরাদের বৈসু ও তঞ্চঙ্গ্যাদের বিষু—নামের ভিন্নতা থাকলেও পার্বত্য এলাকার সব জাতিগোষ্ঠীর প্রাণের এই উৎসব এবার পেয়েছে আনুষ্ঠানিক রূপ। বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, চাংক্রান, চাংলান, পাতা, বিহু—এই ধারাবাহিকতায় পাঁচ দিনব্যাপী উৎসব শুরু হয়েছে রাঙ্গামাটিতে।
সোমবার (৬ এপ্রিল) বিকেলে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের উদ্যোগে একটি রঙিন শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। শোভাযাত্রায় বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তরুণ-তরুণীরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান করে অংশগ্রহণ করেন। এটি রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে শেষ হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের এই সামাজিক উৎসব ঘিরে শহর ও পাহাড়ি পল্লীগুলো ছিল প্রাণবন্ত। চাকমারা বিজু, ত্রিপুরারা বৈসু, মারমারা সাংগ্রাই, তঞ্চঙ্গ্যারা বিষু এবং অহমিয়ারা বিহু—সবেই মিলিতভাবে অংশগ্রহণ করেন।
মেলার উদ্বোধন করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান। এরপর উপস্থিত অতিথিরা বেলুন উড়িয়ে আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন।
পাহাড়ি উৎসবে প্রতিটি জাতির নিজস্ব ঐতিহ্য ফুটে উঠেছে। মারমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী জলকেলি, বাঁশ খরম দিয়ে হাঁটা প্রতিযোগিতা, নারীদের ‘বেইন বুনন’, ‘পাঁজন রান্না প্রতিযোগিতা’, ‘ঘিলা খেলা’, ‘নাদেং খেলা’ এবং ত্রিপুরাদের ‘গরিয়া নৃত্য’ দর্শকপ্রিয় হয়েছে। বিক্রেতারা স্থানীয় ঐতিহ্যকে তুলে ধরে নানা পসরা সাজিয়ে উৎসবকে প্রাণবন্ত করেছেন।
আলোচনা সভায় রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজল তালুকদারের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। বিশেষ অতিথি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) অনুপ কুমার চাকমা, রাঙ্গামাটি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ নাজমুল হক, জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী, সদর জোন কমান্ডার লে. কর্নেল মো. একরামুল রাহাত এবং পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পার্বত্য মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান বলেন, “সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর হারানো ঐতিহ্য সংরক্ষণে আমাদের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সমগ্র দেশকে উন্নতির পথে এগিয়ে নেওয়া হবে।”
জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার বলেন, “পার্বত্যাঞ্চলের ১৩টি ভাষাভাষী জাতিসত্তাকে একত্রিত করে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করতে হবে। এই মেলার মাধ্যমে আনন্দ, ঐক্য ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধি আরও বৃদ্ধি পাবে।”
উৎসব চলবে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত। ৯ এপ্রিল থেকে চার দিনব্যাপী নানান ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান শুরু হবে। মারমা সংস্কৃতি সংস্থার সাংগ্রাই জলোৎসবের মাধ্যমে ১৭ এপ্রিল শেষ হবে পার্বত্য রাঙ্গামাটির এই বৃহত্তম সামাজিক অনুষ্ঠান।