চলচ্চিত্র সাংবাদিক ও গবেষক ফাহিম শাহরিয়ার রুমিঃ

বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনে অনেক শিল্পীর নাম হয়তো ইতিহাসের পাতায় কম আলো পায়, তবে তাদের অবদান অমূল্য। এমন একজন নীরব কিন্তু প্রভাবশালী সঙ্গীতস্রষ্টা হলেন রাজা হোসেন খান। তিনি ছিলেন সুরকার, বেহালা বাদক এবং চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালক, যিনি বাংলাদেশের সংগীত ও চলচ্চিত্রে এক স্বতন্ত্র ধারা স্থাপন করেছিলেন। তাঁর জন্মদিন শুধু একজন শিল্পীর স্মরণ নয়, বরং একটি সঙ্গীতধারার ইতিহাস পুনরায় অনুভব করার সুযোগ।

রাজা হোসেন খান ১৯৩৮ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার এক সঙ্গীতনিবেদিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা নায়েব আলী খান ছিলেন সঙ্গীতজ্ঞ, যেখান থেকে রাজা হোসেন শৈশবে সঙ্গীত শিক্ষা শুরু করেন। ছোটবেলা থেকেই বেহালার প্রতি গভীর আকর্ষণ এবং দক্ষতা তাঁর শিল্পীজীবনের ভিত্তি তৈরি করে।

তিনি উপমহাদেশের বিখ্যাত সঙ্গীত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি কিংবদন্তি সঙ্গীতগুরু আলাউদ্দিন খান–এর আত্মীয় এবং সুরকার আয়াত আলী খান–এর পরিবারের সদস্য। এই পরিবারই ভারতীয় উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে অসংখ্য শিল্পী জন্মানোর পেছনে পরিচিত।

শৈশব থেকে সঙ্গীতকে সাধনা হিসেবে গ্রহণ করে, রাজা হোসেন খান কলকাতায় যান উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য। সেখানে তিনি বাহাদুর খান ও পরে আলী আকবর খান–এর কাছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সূক্ষ্ম জ্ঞান অর্জন করেন। এর ফলে তিনি একজন দক্ষ বেহালা বাদক ও সুরকার হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন।

ঢাকায় ফিরে তিনি যোগ দেন ঢাকা রেডিও (বর্তমান বাংলাদেশ বেতার)–এ স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে। এখানে তিনি অসংখ্য গান পরিবেশন ও সুরারোপ করেন। তাঁর সুর ছিল সহজ অথচ গভীর আবেগময়, যা শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

চলচ্চিত্রেও রাজা হোসেন খান সঙ্গীত পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র– “ঢেউয়ের পর ঢেউ” (১৯৭০), “শাস্তি” (১৯৮৪), “যাহান বাজে শেহনাই”। তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের উপাদানকে আধুনিক সংগীতের সঙ্গে মেলিয়ে নতুন সুরভাষা তৈরি করেছিলেন।

তাঁর সঙ্গীতের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল শাস্ত্রীয় রাগভিত্তিক সুর, যা আধুনিক ও জনপ্রিয় ধারার সঙ্গে সমন্বয় করে অসাধারণ অনুভূতি প্রকাশ করত। বেহালার আবেগময় ধ্বনি তাঁর সঙ্গীতকে এক বিশেষ মাত্রা প্রদান করেছিল।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রাথমিক সময়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি সঙ্গীত রচনা করেন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের সঙ্গীতকে উপস্থাপন করেন।

রাজা হোসেন খানের প্রতিভা চলচ্চিত্র “সূর্যগ্রহণ”–এর জন্য রাষ্ট্রীয় পুরস্কারেও স্বীকৃতি পেয়েছিল। ব্যক্তিজীবনে তিনি শান্ত, বিনয়ী ও সঙ্গীতনিবেদিত ছিলেন। তিন পুত্র—পলাশ, তিতাস ও প্লাবন—এর মধ্যে পরিবারের সাথে সঙ্গীতচর্চার মধ্যেই তাঁর জীবন আবর্তিত হয়েছে।

দুঃখজনকভাবে ১৯৮৯ সালের ৬ মার্চ একটি সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মাত্র ৫০ বছর বয়সে চলে গেলেও তাঁর সৃষ্টি আজও বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনের অমূল্য সম্পদ।

উপসংহার:
আজ তাঁর জন্মদিনে আমরা স্মরণ করি শুধু একজন সুরকারকে নয়, বরং একটি সঙ্গীত ঐতিহ্যকে। রাজা হোসেন খানের সুর, বেহালার ধ্বনি ও সঙ্গীত সাধনা বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে এক স্থায়ী অমর নিদর্শন হয়ে আছে।

#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}