সাক্ষাৎকার: চিত্র সাংবাদিক- ফাহিম শাহরিয়ার রুমি
আলাপচারিতায়: চলচ্চিত্র গবেষক ও নির্মাতা রাথিন মজুমদার

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে Uttam Kumar কেবল জনপ্রিয় নায়ক নন; তিনি এক সাংস্কৃতিক নির্মাণ। দেশভাগ-পরবর্তী বঙ্গসমাজের মানসিক পুনর্গঠন, মধ্যবিত্তের আত্মপরিচয় সংকট, প্রেমের নতুন ভাষা ও আধুনিকতার দ্বন্দ্ব—সব মিলিয়ে তাঁর তারকাসত্তা এক বিশেষ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠে। তাঁর অভিনয়ভাষা যেমন স্বতন্ত্র, তেমনি ব্যক্তিত্বও বহুমাত্রিক ‘কালচারাল টেক্সট’। এ প্রসঙ্গে চলচ্চিত্র গবেষক ও নির্মাতা রাথিন মজুমদারের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপের নির্বাচিত অংশ তুলে ধরা হলো।

প্রথম পর্ব: ঐতিহাসিক ও সমাজ-রাজনৈতিক প্রেক্ষিত

প্রশ্ন: দেশভাগ-পরবর্তী বঙ্গসমাজের সংকটের প্রেক্ষাপটে তাঁর আবির্ভাবকে কীভাবে দেখেন?
রাথিন মজুমদার: দেশভাগ কেবল ভৌগোলিক বিভাজন ছিল না; এটি ছিল গভীর মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয়। উদ্বাস্তু-চেতনা, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক পুনর্গঠনের ভেতর মধ্যবিত্ত বাঙালি নতুন আত্মপরিচয় খুঁজছিল। এই সন্ধিক্ষণে উত্তম কুমার এমন এক পুরুষ-ইমেজ নির্মাণ করেন, যা সংযত, সংবেদনশীল ও নৈতিক। তিনি ভাঙা সময়ের ভেতর স্থিতিশীলতার প্রতীক হয়ে ওঠেন। ফলে তাঁর আবির্ভাবকে শুধু চলচ্চিত্র-ঘটনা নয়, সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবেও দেখা উচিত।

প্রশ্ন: ১৯৫০–৬০-এর দশকের বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পের টানাপোড়েন তাঁর তারকাসত্তা নির্মাণে কী ভূমিকা রেখেছিল?
রাথিন: সে সময় একদিকে বাণিজ্যিক স্টুডিও-ব্যবস্থা, অন্যদিকে শিল্পধর্মী চলচ্চিত্রের উত্থান। উত্তম কুমার এই দুই ধারার মাঝখানে ভারসাম্য তৈরি করেন। তিনি দর্শকপ্রিয়তা বজায় রেখেও অভিনয়ের সূক্ষ্মতা রক্ষা করেন। এই দ্বৈত অবস্থানই তাঁর তারকাসত্তাকে বহুমাত্রিক করে তোলে।

দ্বিতীয় পর্ব: অভিনয়শৈলী ও নন্দনতত্ত্ব

প্রশ্ন: তাঁর অভিনয়ভাষাকে কি স্বতন্ত্র “বাঙালি স্ক্রিন অ্যাক্টিং স্টাইল” বলা যায়?
রাথিন: অবশ্যই। তিনি থিয়েট্রিক্যাল অতিনাটকীয়তা থেকে বেরিয়ে ক্যামেরা-সচেতন, সংযত ও অন্তর্মুখী অভিনয়ভঙ্গি নির্মাণ করেন। সংলাপপ্রক্ষেপণ ছিল মোলায়েম, চোখের ব্যবহার গভীর। এই সংযমই তাঁকে আধুনিক করে তোলে।

প্রশ্ন: রোমান্টিক নায়ক হিসেবে তাঁর নির্মিত পুরুষ-ইমেজ কতটা আলাদা?
রাথিন: তিনি পিতৃতান্ত্রিক কর্তৃত্বের বদলে সহমর্মিতা ও সমমর্যাদার সম্পর্ক তুলে ধরেন। প্রেম তাঁর কাছে কেবল উচ্ছ্বাস নয়; দায়িত্ব ও আত্মসম্মানের বিষয়। এতে মধ্যবিত্ত সমাজে নতুন মানদণ্ড তৈরি হয়।

তৃতীয় পর্ব: চলচ্চিত্র বিশ্লেষণ

প্রশ্ন: Harano Sur-এ তাঁর চরিত্রায়নকে কীভাবে দেখবেন?
রাথিন: স্মৃতিহীনতার ভেতর দিয়ে আত্মপরিচয়ের সংকট ফুটে ওঠে। এখানে তিনি ভঙ্গুরতা ও মানবিকতার সূক্ষ্ম রূপ নির্মাণ করেন।

প্রশ্ন: Saptapadi-তে প্রেম ও ধর্মীয় পরিচয়ের দ্বন্দ্ব কতটা রাজনৈতিক?
রাথিন: প্রেম সেখানে সামাজিক কাঠামোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়ে ওঠে। তাঁর সংযত অভিনয় এই রাজনৈতিক মাত্রাকে গভীর করে।

প্রশ্ন: Nayak-এ তাঁর অভিনয়কে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
রাথিন: এখানে Satyajit Ray তাঁর তারকাসত্তাকে আত্মসমালোচনার আয়নায় দাঁড় করান। উত্তম কুমার নিজের ইমেজ ভেঙে অনিশ্চিত ও দ্বিধাগ্রস্ত মানুষের প্রতিকৃতি নির্মাণ করেন। এটি তাঁর অভিনয়জীবনের শীর্ষবিন্দু।

চতুর্থ পর্ব: সুচিত্রা–উত্তম জুটি

প্রশ্ন: সুচিত্রা–উত্তম জুটিকে কীভাবে দেখেন?
রাথিন: Suchitra Sen-এর সঙ্গে তাঁর জুটি মধ্যবিত্ত প্রেম-আদর্শের সাংস্কৃতিক নির্মাণ। তাঁদের রসায়ন কেবল জনপ্রিয়তা নয়; সামাজিক স্বপ্নের প্রতিফলন।

প্রশ্ন: এই জুটির চলচ্চিত্রে নারী-পুরুষ সম্পর্কের ভারসাম্য কেমন ছিল?
রাথিন: নারী চরিত্রগুলো দৃঢ় ও সিদ্ধান্তক্ষম। সম্পর্কটি পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে দাঁড়ানো—যা সময়ের তুলনায় প্রগতিশীল।

পঞ্চম পর্ব: প্রযোজক ও সংগঠক হিসেবে অবদান

প্রশ্ন: প্রযোজক হিসেবে তাঁর ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
রাথিন: তারকাখ্যাতিকে পুঁজি করে তিনি প্রযোজনায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেন। এতে শিল্পের অর্থনৈতিক কাঠামো কিছুটা স্থিতি পায় এবং নতুন প্রজন্মের জন্য পথ খুলে যায়।

ষষ্ঠ পর্ব: সমালোচনা ও সংকট

প্রশ্ন: টাইপকাস্ট হওয়ার অভিযোগ কতটা যুক্তিযুক্ত?
রাথিন: রোমান্টিক ইমেজের কারণে অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু Nayak প্রমাণ করে তিনি বহুমাত্রিক অভিনেতা।

প্রশ্ন: শেষ পর্যায়ের চলচ্চিত্রে কি ট্র্যাজিক আত্মসচেতনতা ছিল?
রাথিন: সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজের অবস্থান নিয়ে এক অন্তর্গত সংলাপ দেখা যায়—যা তাঁর অভিনয়কে আরও মানবিক করে তোলে।

সপ্তম পর্ব: উত্তরাধিকার

প্রশ্ন: বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাঁর প্রভাব কতটা দৃশ্যমান?
রাথিন: আজও তাঁর সংযম, সংলাপের মাধুর্য ও রোমান্টিক ইমেজ অনুকৃত হয়। তিনি কেবল অতীত নন; বর্তমানেও প্রাসঙ্গিক।

প্রশ্ন: এক বাক্যে মূল্যায়ন করলে—তিনি ‘স্টার’, ‘আইকন’, না ‘কালচারাল টেক্সট’?
রাথিন: তিনি তিনটিই—তবে সবচেয়ে বেশি তিনি এক ‘কালচারাল টেক্সট’। তাঁর ভেতর দিয়ে আমরা এক সময়ের বাঙালি মনস্তত্ত্ব, স্বপ্ন ও সংকটকে পড়তে পারি।

#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}