
ভেনেজুয়েলা বিশ্বজুড়ে পরিচিত মূলত বিশাল তেলসম্পদের জন্য। তবে বাস্তবতা হলো, দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদ শুধু তেলেই সীমাবদ্ধ নয়। ভেনেজুয়েলার ভূগর্ভে রয়েছে বিপুল স্বর্ণ, প্রাকৃতিক গ্যাস, লোহা, কয়লা, নিকেল, বক্সাইট ও হীরাসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, যা দেশটিকে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে আলাদা গুরুত্ব দিয়েছে।
দীর্ঘদিন বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত তেল মজুতধারী দেশ হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে ভেনেজুয়েলা। পাশাপাশি দেশটির খনিজসম্পদের পরিমাণও অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এসব সম্পদ একদিকে যেমন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর কৌশলগত আগ্রহও বাড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন ও উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভেনেজুয়েলার তেল খাতের পাশাপাশি খনিজ খাত পুনরুজ্জীবনের কথা বলা হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, লক্ষ্য শুধু তেল উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, বরং দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকা খনিজ সম্পদকে বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলায় ইস্পাত তৈরিতে ব্যবহৃত লোহাসহ বিভিন্ন কৌশলগত খনিজের বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে, যা আধুনিক প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ পেলে দেশের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। দীর্ঘদিন অবহেলা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এসব খনিজ পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
তেল সম্পদের দিক থেকে ভেনেজুয়েলা এখনো বিশ্বে শীর্ষস্থানীয়। সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি প্রমাণিত তেল মজুত রয়েছে, যার বড় অংশ ওরিনোকো বেল্ট অঞ্চলে অবস্থিত। এই তেল তুলনামূলকভাবে ভারী হওয়ায় উত্তোলন ব্যয় বেশি হলেও বৈশ্বিক বাজারে এর কৌশলগত গুরুত্ব কমেনি। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চীন দীর্ঘদিন ধরে ভেনেজুয়েলার অন্যতম প্রধান তেল ক্রেতা হিসেবে ভূমিকা রেখেছে।
তেলের পাশাপাশি প্রাকৃতিক গ্যাসেও ভেনেজুয়েলার অবস্থান শক্তিশালী। প্রমাণিত গ্যাস মজুতে দেশটি বিশ্বে শীর্ষ দশের মধ্যে রয়েছে এবং দক্ষিণ আমেরিকার মোট গ্যাস সম্পদের বড় অংশই ভেনেজুয়েলার দখলে। ভবিষ্যতে আঞ্চলিক জ্বালানি নিরাপত্তায় এই গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
স্বর্ণ সম্পদের ক্ষেত্রেও ভেনেজুয়েলা ল্যাটিন আমেরিকার অন্যতম সমৃদ্ধ দেশ। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্বর্ণ রয়েছে। এর বাইরে ওরিনোকো মাইনিং আর্ক এলাকায় বিপুল অব্যবহৃত স্বর্ণের মজুত থাকার কথা বলা হয়, যা এখনও পুরোপুরি উত্তোলন করা হয়নি।
এছাড়া ভেনেজুয়েলায় কয়লা ও লোহার আকরিকের বড় ভাণ্ডার রয়েছে। শিল্পখাতে ব্যবহৃত নিকেল ও বক্সাইটের মজুতও দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে, যা ভবিষ্যতে ভারী শিল্প ও অবকাঠামো উন্নয়নের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। হীরা সম্পদের ক্ষেত্রেও দেশটি সমৃদ্ধ হলেও অবৈধ খনন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এই খাত এখনো পুরোপুরি বিকশিত হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, তেল ও খনিজসম্পদের এই বিশাল ভাণ্ডারই ভেনেজুয়েলাকে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর আগ্রহের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। তাই দেশটিকে ঘিরে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক তৎপরতাকে শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির আলোকে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি ও খনিজভিত্তিক ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
মন্তব্য করুন