আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত গোপালগঞ্জ-১ (মুকসুদপুর-কাশিয়ানী আংশিক) আসনে বইছে নতুন রাজনৈতিক হাওয়া। দীর্ঘ কয়েক দশক পর এই প্রথম নৌকা প্রতীকহীন নির্বাচনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে এ আসনের ভোটাররা।
দলীয় কার্যক্রম স্থগিত থাকায় আওয়ামী লীগ নির্বাচনী মাঠের বাইরে থাকায় আসনটি দখলে নিতে বিএনপি, জামায়াত, গণঅধিকার পরিষদ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে শুরু হয়েছে ব্যাপক তোড়জোড়। সব মিলিয়ে এলাকায় এখন এক চতুর্মুখী লড়াই বলে মনে করছেন ভোটাররা। আসনটিতে স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল।
তবে ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এবার ভোটের হিসাব-নিকাশ বদলে গেছে। ৩ লাখ ৯৯ হাজার ৫১০ জন ভোটারের এ আসনে এখন আলোচনার তুঙ্গে ‘কারাগার বনাম মাঠের’ লড়াই। এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন কারাবন্দী দুই প্রার্থী। তারা হলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আশরাফুল আলম শিমুল (ফুটবল) এবং গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী কাবির মিয়া (ট্রাক)। আইনি জটিলতা কাটিয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশে তারা প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ায় স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে।
আশরাফুল আলম শিমুল স্বতন্ত্র হয়ে মুকসুদপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র ও উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন। ইতিপূর্বে কোনো নির্বাচনেই তিনি পরাজিত হননি। তার জনপ্রিয়তার একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে তার পারিবারিক পরিচিতি। অন্যদিকে কাবির মিয়া শুরুতেই হোঁচট খেলেও উচ্চ আদালতের রায়ে মাঠে ফেরায় তাঁর সমর্থকদের মধ্যে নতুন করে প্রাণসঞ্চার হয়েছে।
এ দুই প্রার্থীর সমর্থকদের ধারণা, কারাবন্দী প্রার্থীদের প্রতি সাধারণ মানুষের ‘সহানুভূতি’ ভোটে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিএনপির পক্ষে মাঠে রয়েছেন কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিমুজ্জামান সেলিম (ধানের শীষ)। আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংকে হানা দিয়ে আসনটি নিজেদের দখলে নিতে মরিয়া বিএনপি। বসে নেই জামায়াতে ইসলামীও। মুহাম্মদ আবদুল হামীদ মোল্যা (দাঁড়িপাল্লা) নীরবে মাঠ গুছিয়ে নিচ্ছেন।
এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. মিজানুর রহমান (হাতপাখা), জাতীয় পার্টির সুলতান জামান খান (লাঙ্গল) এবং সিপিবির নীরদ বরন মজুমদারসহ (কাস্তি) মোট নয়জন প্রার্থী ভোটের মাঠে লড়ছেন। অতীতের নির্বাচনী পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী কর্ণেল (অব.) ফারুক খান একাধিপত্য বজায় রেখেছিলেন। বিশেষ করে ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি ৩ লাখের বেশি ভোট পেয়েছিলেন, যেখানে বিএনপির ধানের শীষ প্রতিকের প্রার্থী এফ ই শরফুজ্জামান পেয়েছিলেন মাত্র ৯৫৭ ভোট।
তবে ২০২৪ সালের সবশেষ নির্বাচনে চিত্র কিছুটা বদলাতে শুরু করে, যেখানে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী কাবির মিয়া ১ লাখ ৮ হাজারেরও বেশি ভোট পেয়ে চমক দেখিয়েছিলেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের বিপুল সংখ্যক সমর্থক ও ভোটার এখন কোন দিকে ঝুঁকবেন, তা নিয়েই চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। কোনো দল বা প্রার্থী এ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট ব্যাংকটি নিজেদের বাক্সে নিতে পারবেন, তার ওপরই নির্ভর করছে জয়ের মুকুট।
ভোটাররা বলছেন, এবার প্রতীক দেখে নয়, প্রার্থীর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি এবং এলাকার উন্নয়নে কার ভূমিকা কেমন হবে, তা বিবেচনা করেই তারা তাদের মূল্যবান রায় দেবেন। তৃণমূল ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ আর রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সমীকরণ সব মিলিয়ে গোপালগঞ্জ-১ আসনের নির্বাচনী লড়াই এখন এক ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছেছে।
মন্তব্য করুন